
নতুন, ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের অনলাইন বিজনেস মডেল কেমন হওয়া উচিত?
বাংলাদেশে ক্রমাগত বেড়ে চলছে অনলাইন ব্যবসা। আর এই ব্যবসায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিচরণ সব থেকে বেশি। প্রায়শই দেখা যায় একজন উদ্যোক্তা তার ব্যবসার সঠিক মডেল ব্যবহার না করায় কিছুদিন পর সে তার উদ্যোগ হারিয়ে ফেলছে।
তাই আজকের আর্টিকেলে এই উদ্যোক্তাদের জার্নি কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা করছি। এটি একটি ডিটেইল আর্টিকেল যা আপনাকে সঠিক গাইডলাইন দিবে আপনার উদ্যোগকে ব্যবসা বানাতে। তাই একটু সময় দিয়ে হলেও সম্পূর্ন আর্টিকেলটি পড়বেন। চলুন শুরু করা যাক:
১. বিজনেস প্লাটফর্ম নির্ধারন: অনলাইন একটি বিশাল স্পেস, এখানে প্লাটফর্মের সংখ্যাও প্রচুর। ব্যবসার জন্য সঠিক প্লাটফর্ম চয়েস করা আপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে।
বাংলাদেশে জনপ্রিয় অনলাইন প্লাটফর্মগুলো হলো:
ক. ফেসবুক
খ. ইউটিউব
গ. ইন্সটাগ্রাম
ঘ. টিকটক
এই চারটি প্লাটফর্ম একেক ধরনের ব্যবসার জন্য একেকভাবে জনপ্রিয়।
যেমন:
ক. আপনি ফ্যাশন বা বিউটি প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করেন, তাহলে আপনার জন্য ফোকাস মার্কেট হবে ফেইসবুক এবং ইন্সটাগ্রাম।
খ. আপনি হ্যান্ডক্রাফট বা গিফট আইটেম নিয়ে কাজ করেন আপনার টার্গেট প্লাটফর্ম হবে ফেইসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম ও টিকটক।
গ. আপনি যদি পাইকারী বিক্রেতা হন, তাহলে আপনার জন্য টার্গেট মার্কেট হবে ইউটিউব, ফেইসবুক।
আপনার ব্যবসার জন্য সঠিক টার্গেট প্লাটফর্ম নির্ধারণ আপনার প্রডাক্টকে সঠিক মানুষের কাছে পৌছে দিবে।
২. সঠিকভাবে বিজনেস প্রোফাইল তৈরী: প্লাটফর্ম নির্ধারন করার পর আপনার পরবর্তী কাজ সকল প্লাটফর্মগুলো আপনার ব্যবসার উপর বেসড করে সঠিকভাবে সাজিয়ে নেওয়া।
যেসব বিষয়ে ফোকাস করা উচিত:
ক. ব্যবসার নাম
খ. ব্যবসার ক্যাটেগরী
গ. ব্যবসার ফোন নাম্বার
ঘ. ব্যবসার লোগো (লোগো যেহেতু একটি দীর্ঘস্থায়ী সিদ্ধান্ত এটি আপনার ব্রান্ড গাইড মেইনটেইন করে নির্বাচন করা উচিত। এছাড়াও লোগো ব্যবহারের সময় সঠিকভাবে সেটা সেট করা উচিত। আমি ম্যাক্সিমাম পেইজেই লক্ষ করেছি লোগোটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না।)
ঙ. কাভার ফটো (কাভার ফটো বিজনেসের উপর বেসড করে তৈরী করা উচিত। এটি সরাসরি ব্যবসার ব্রান্ডিং এ ব্যবহৃত হয়। আমি ফেইসবুকে ৯০% পেইজ দেখেছি যেখানে সঠিকভাবে কাভার ফটো ব্যবহার করা হয়নি। কারো কাভার মোবাইলে ভালো বোঝা যায়, তো ডেক্সটপে ভালো বুঝা যায় না, আবার কারো ডেক্সটপে ভালো বুঝা যায় তো মোবাইলে যায় না। এটা ঠিক ভাবে সেট করা উচিত।)
চ. এড্রেস (যদি থাকে)
ছ. বিজনেস টাইমিং
জ. ইউজার নেইম
ঝ. বিজনেস বায়ো, শর্ট ডেস্ক্রক্রিপশন, লং ডেস্ক্রিপশন।
ঞ. সোস্যাল মিডিয়া, ই-মেইল, ওয়েবসাইট প্রভৃতি তথ্য।
আপনার প্রোফাইলগুলো সকল প্লাটফর্মগুলোতে একই তথ্যে সাজানো উচিত। এটি ক্লায়েন্টকে আপনার ব্যবসায় আস্থা দেয়।
৩. প্রোফাইল গ্রোথ: প্রোফাইল সুন্দর করে সাজানোর পর সরাসরি সেলসে না গিয়ে সেই প্রোফাইল থেকে একটি ওই ব্যবসা সম্পর্কিত এনাউন্সমেন্ট পোস্ট করা উচিত। এরপর ওই প্রোফাইলে নিজের কাছের মানুষজনদের ইনভাইট করা উচিত প্রয়োজনে এডস দিয়ে ১০০০-২০০০ হাজার ফলোয়ার নিয়ে আসা উচিত। কারণ আপনার থেকে পন্য কেনার আগে আপনার ব্যবসাকে ক্লায়েন্ট ভালো ভাবে অবজার্ব করবে। তারপরেই অর্ডার করবে।
৪. প্রোডাক্ট প্রেজেন্টেশন: প্রোডাক্ট প্রেজন্টশনে এসে আপনাকে সুন্দর করে আপনার প্রোডাক্টগুলোকে পোস্ট করা উচিত। আমরা অনেকেই খুব সুন্দরভাবে প্রোডাক্টকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারি না জন্য আমাদের প্রোডাক্ট সেলস টা ব্যহত হয়।
এজন্য আপনাকে একজন প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফারকে দিয়ে বিভিন্ন এংগেল থেকে বিভিন্নভাবে প্রোডক্টটিকে ফটোশুট করানো উচিত। এরপর সেটি একজন গ্রাফিক ডিজাইনারকে দিয়ে প্রোডাক্ট টেমপ্লেট গাইড মেইনটেইন করে সাজিয়ে নেওয়া উচিত।
তাহলে আপনার প্রোডাক্টগুলো সুন্দরভাবে ক্লায়েন্টের কাছে উপস্থাপিত হবে এবং তা ক্লায়েন্ট এটেনশন নিবে। যা তার ব্যবসায় প্রভাব ফেলবে।
৫. ক্লায়েন্ট ইন্টারেস্ট আইডেন্টিফিকেশন: প্রোডাক্ট প্রেজেন্ট করার পর আপনার কোন প্রোডাক্টে ক্লায়েন্টের কি রকম ইন্টারেস্ট আছে সেটা তৈরী করতে আপনি (ইন্টারেস্ট গোলে) প্রত্যেকটা পোস্ট ১ ডলার করে বুস্ট বা এডস চালু করে দিন এবং এডসে মেসেজ বা কল বাটন ব্যবহার করুন।
এটা থেকে আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনার প্রোডাক্ট প্রেজেন্টশন কেমন এটেনশন নিচ্ছে। আপনার টার্গেট কাস্টমারদে পাশাপাশি এটি আপনার পেইজের এনগেজমেন্টও গ্রো করবে।
৬. এডস স্ট্রেটেজি: আপনি যেহেতু ফেইসবুকে বা অন্য সোস্যালে আপনার প্রোডাক্ট সেল করবেন, তাহলে আপনাকে অবশ্যই সেলস এডস রান করতে হবে। এটা বর্তমানে অনেকটাই বাধ্যগত একটি জিনস।
আমরা বেশিরভাগ মানুষ এই স্টেজে বড় ভুল করে ফেলি। আমরা এডস স্ট্রেটেজি তৈরী না করেই সহজেই আমরা একটা এডস বা বুস্ট দিয়ে ফেলি। এই ব্যাপারটা পুরো অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতন। এখানে পন্য সেল হলে হলো না হলে নাই।
কিন্তু আপনি যদি সঠিকভাবে এডস স্ট্রেটেজি বানাতে পারেন, তবে তা আপনার সেলস টার্গেট পুরণ করবে।
আপনার সেলস স্ট্রেটেজি তে কি কি বিবেচনা করা উচিত?
ক. আপনার টার্গেট কাস্টমার কারা? (তাদের বয়স, লোকেশন, জেন্ডার, ইন্টারেস্ট, বিহেভিয়ার, এক্টিভিটি)
খ. আপনার কতটি প্রোডাক্ট সেল টার্গেট আছে প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি মাসে?
গ. আপনার প্রতিটি কাস্টমার পেতে আপনি ফেইসবুকে কত ডলার ব্যয় করতে চান।
ঘ. আপনার এডস কপি গুলো কেমন হবে?
ইত্যাদি।
৭. এডস কপি নির্বাচন: এডস স্ট্রেটেজি তৈরী করার পরে আপনার একটি ভালো এডস কপি তৈরী করা উচিত। এডস কপি মুলত এডস কনটেন্ট। আপনার লেখা, ছবি বা ভিডিও এই সবগুলোই একেকটি এডস কপি।
ভালো এডস কপি বানাতে ৫টি বিষয় প্রাধান্য দেওয়া উচিত:
ক. আপনারা কে?
খ. কাস্টমার আপনার থেকে কি কিনবে?
গ. কাস্টমার এই প্রোডাক্টটি কেন কিনবেন?
ঘ. কাস্টমার কেন আপনাদের থেকেই কিনবেন?
ঙ. কাস্টমার কিভাবে কিনবে?
এগুলো বিবেচনা করে আপনার লেখা, প্রোডাক্ট ইমেজ তৈরী করতে হবে।
৮. এডস রান: সব রেডি হবার পর এডস ম্যানেজার ব্যবহার করে আপনাকে এডস রান করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি বুস্ট করলেও ক্ষতি নেই। বুস্ট এডস বেসিক্যালি একই ব্যপার। তবে এডস ম্যানেজার থেকে এডস দিলে আপনি অনেকগুলো বিষয় বিবেচনা করে এডস দিতে পারবেন।
৯. কাস্টমার জার্নি: এডস দেবার পর থেকে আপনার কাস্টমার জার্নি শুরু হবে। এবার কাস্টমার আপনার ব্যবসায় আসবেন। কেউ আপনার থেকে পন্য কিনবেন, আবার কেউ আপনার থেকে কিনবেন না।
এটি ব্যবসার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। আমরা এটি নিয়ে খুব বেশি যত্নশীল হইনা ফলে কাস্টমারকে আমাদের ব্যবসায় বেশিদিন ধরে রাখতে পারি না। এই জায়গাটা নিয়ে সিরিয়াসলি কাজ করলে আপনি ভালো অবস্থানে যেতে পারবেন।
চলুন কাস্টমার জার্নির স্টেপগুলো দেখা যাক?
ক. অনেক কাস্টমার আপনাকে পন্য কিনতে মেসেজ করবে
খ. কিছু কাস্টমার আপনার থেকে পন্য কিনবে
গ. এরপর আপনি তার ঠিকানায় পন্য পাঠাবেন.
ঘ. এরপর কাস্টমার পন্য গ্রহণ করবে।
ঙ. কিছু কাস্টমার পন্য গ্রহণ করবে না।
চ. অল্প কিছু কাস্টমার আপনার থেকে পন্য ডিফেক্ট হওয়ায় রিটার্ন পাঠাবে।
এটা মুলত সব ব্যবসার একটি ফোকাস স্টেজ।
এবার আপনার প্রত্যেকটা স্টেজ নিয়ে কাজ করা উচিত এবং প্রবলেম ফিক্সড করা উচিত।
যেমন:
ক. কেন বেশিরভাগ মানুষ মেসেজ করার পরেও আপনার থেকে পন্য অর্ডার করলো না? এটি কি পন্যের দাম বেশি বা ডেলিভারী চার্জ বেশি, নাকি আপনি গুছিয়ে কথা বলতে পারছেন না?
এরকম আরো অনেক কারণ হতে পারে। যদি সেটা সমাধানযোগ্য হয় তবে তা সমাধান করে ওই কাস্টমারের পুনরায় এটেনশন নিন। অন্যথায় ওই কাস্টমারগুলোকে আপনার বিজনেস থেকে ব্যান করুন বা এগ অডিয়েন্স হিসেবে মার্ক করুন। কারণ তারা কখনই আপনার থেকে পন্য নিবেন না।
খ. কাস্টমারকে প্রোডাক্ট পাঠানোর পর কেন উনি তা রিসিপ্ট করলেন না?
গ. ডিফেক্ট প্রোডাক্ট পাঠানোর পর কত দ্রুত আপনার ক্লায়েন্ট আপনার থেকে পন্য পুনরায় পাচ্ছেন। এটি তাকে সেটিসফাই করছে।
ঘ. আপনার ডেলিভারী ম্যানের আচরণ কাস্টমারকে কি সেটিসফেকশন দিচ্ছে।
ঙ. আপনার ডেলিভারী সিস্টেম কতটা ফাস্ট?
১০. সলভ মিসটেক এন্ড প্রবলেমস: এবার আপনার সব প্রবলেম এবং মিসটেক গুলো সলভ করা উচিত।
১১. কাস্টমারের যত্ন নেওয়া: আপনার কাস্টমার প্রোডাক্ট ঠিকভাবে পেলেন কিনা, প্রোডাক্টটা কেমন ছিলো ইত্যাদি তথ্য ফোন বা মেসেজে নেওয়া।
একটি কাস্টম অডিয়েন্স করে আপনার কাস্টমারকে আপনার পরবর্তী প্রোডাক্ট প্রমোশন করা।
কাস্টমারের জন্মদিনে তাকে উইস করা। বা ডেলিভারী করার সময় ছোট চিরকুট, চকলেট বা ইম্প্রেসেবল গিফট দেওয়া।
এটি আপনার ব্যবসাকে কাস্টমারকে মনে রাখতে সহায়তা করবে।
১২. ওয়েবসাইট বানানো: আপনার ব্যবসার বয়স ৩-৬ মাস হবার পরে আপনার ওয়েবসাইট নিয়ে ভাবা উচিত। আপনার ওয়েবসাইট করার সময় আপনার বিজনেস মডেল এবং কাস্টমাত জার্নি বিবেচনা করা উচিত। তারপর একজন ভালো মার্কেটার এবং ডেভলপারের কন্সাল্টেসীতে সুন্দর করে প্লান করে সাজানো উচিত।
এই মডলে চললে একটি নতুন উদ্যোগ ১-২ বছরের মধ্যে একটি ভালো ব্যবসায় রুপান্তর করা সম্ভব। এরপর নতুন প্লান নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করুন নতুন ভাবে সামনে আগান।
সবসময় মনে রাখবেন, অনলাইন বিজনেস কোন ম্যাজিক না। এটি শুধু মাত্র একটি সিস্টেম। ব্যবসার বেসিক প্রিন্সিপালগুলোকে মাথায় রেখেই সামনে আগানো উচিত। তাহলেই একটি উদ্যোগ ব্যবসা হবে।
ধন্যবাদ


