
ই-কমার্স ওয়েবসাইটের A-Z
ই-কমার্স! বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসার একটি অন্যতম ম্যধ্যম। ধীরে ধীরে ব্যবসায়ী ও কাস্টমারগন এফ-কমার্স থেকে ই-কমার্সে সুইচ করছে।
তবে অধিকাংশই সঠিক গাইডলাইনের অভাবে নিজের ই-কমার্স প্লাটফর্মটি বানাতে ভুল করে বসছে। যা কস্টিং বাড়িয়ে দিচ্ছে বা চাহিদা পূরণ করছে না।
আজকের আর্টিকেলটি তে আমি এটি নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা করবো। বরাবরের মতন এটি একটি ডি-টেইল আর্টিকেল হতে যাচ্ছে, আর্টিকেলটি পড়লে আপনি একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে আমি আশাবাদী।
শুরু করা যাক-
শুরুতেই জেনে নেওয়া যাক একটি ওয়েবসাইট করতে যা যা লাগে:
১. ডোমেইন: এটি মূলত একটি ওয়েবসাইটের নাম। এই নামটিকে ডোমেইন বলে। যেমন: Amazon.com। একটি ওয়েবসাইট তৈরী করার সময় ব্যবসার নাম মিল রেখে সর্বনিম্ন ১ বছর মেয়াদি একটি ডোমেইন রেজিস্টার করতে হয়। নতুন একটি .Com ডোমেইন প্লাটফর্ম ভেদে ৮-১৫ ডলার দাম হয়ে থাকে।
২. হোস্টিং: এটি হচ্ছে ওয়েবসাইটের ডাটা স্টোরেজ। এখানে আপনার ওয়েবসাইটের সকল তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এটি মাসিক এবং বাৎসরিকভাবে কেনা যায়। সর্বনিম্ন ১ জিবি থেকে প্রয়োজন অনুসারে আনলিমিটেড ডেটা স্টোরেজ নেওয়া যায়। আমি একটি ই-কমার্স সাইটের জন্য আমি অন্তত ১০ জিবি স্টোরেজ থেকে শুরু করতে বলবো। আনলিমিটেড স্টোরেজ হলে ভালো হয়। দাম ১০ জিবি বছরে আনুমানিক ৫,০০০ টাকা, আনলিমিটেড ৮,০০০-১০,০০০ ম্যাক্সিমাম।
এছাড়াও এখানে ক্লাঊড হোস্টিং সহ আরো কিছু হোস্টিং ফিচার আছে। যেটা ব্যয়বহুল। ব্যবসার শুরুতে বাজেট কম থাকলে ক্লাঊড ট্রাই না করাই উত্তম।
৩. CMS: CMS মানে হচ্ছে কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। যেটা ব্যবহার করে মুলত ওয়েবসাইটের তথ্য হালনাগাদ করা হয়। যেমন আপনার প্রোডাক্ট, ইমেজ, টেক্সট, ভিডিও ইত্যাদি।
CMS সাধারণত ২ প্রকার
ক. রেডিমেড CMS
এটি একটি রেডিমেড সিস্টেম। যেমন: WordPress, Shopify, Wix প্রভৃতি। যা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড বেশি ব্যবহৃত হয়। ওয়ার্ল্ড এর প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট রেডিমেড CMS দ্বারা তৈরী।।
সুবিধা:
a. এটি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড সবাই ব্যবহার করে
b. অনলাইনে সবধরনের রিসোর্স পাওয়া যায়
c. ডেভলপমেন্ট কস্ট কম
d. ডেভলপার এভেইএবল
e. সহজে যে কেউ কাজ করতে পারবে।
f. কোডিং নলেজ প্রয়োজন নেই।
g. মার্কটিং টুল ইচ্ছামত কানেক্ট করা যায়।
অসুবিধা:
a. সবসময় ইচ্ছামত কাস্টমাইজ করা যায় না।
খ. কাস্টম CMS
খ. কাস্টম CMS: এটি সম্পূর্ন নিজের প্রয়োজনমত করা হয়ে থাকে। এখানে যেভাবে খুশি সেভাবে ওয়েবসাইট বানিয়ে নেওয়া সম্ভব। যেমন: Laravel, Node Js, Flutter, php প্রভৃতি।
সুবিধা:
a. ইচ্ছামত তৈরী করা যায়।
b. তুলনামূলক দ্রুত লোড হয়।
অসুবিধা:
a. ডেভলপারকে সবসময় প্রয়োজন হয়। এমনকি সেলারি দিয়ে মাসিক ডেভলপার রাখতে হতে পারে।
b. ডেভলপ কস্ট বেশি।
c. ট্রাকিং টুলস সবসময় সেট করা সম্ভব হয় না।
d. ডেভলপার কম পাওয়া যায়।
e. SEO ফ্রেন্ডলি ওয়েবসাইট সবসময় তৈরী করা যায় না।
f. রিসোর্স কম এভেইলএবল।
g. কোডিং নলেজ থাকতে হয়।
h. সময় বেশি লাগে।
৪. থিম: আপনার ওয়েবসাইটের ডিজাইন কেমন হবে এটির জন্য থিম পচ্ছন্দ করতে হয়। যা দিয়ে সুন্দরভাবে ওয়েবসাইটটির ডিজাইন ফুটিয়ে তোলা হয়। এটি শুধু রেডিমেড CMS এর জন্য প্রযোজ্য। ফ্রি এবং পেইড দু-ধরনের থিম পাওয়া যায়। আপনি চাহিদামত থিম ব্যবহার করতে পারবেন।
৫. ডেভলপমেন্ট: রিকুয়ারমেন্ট অনুসারে সকল কিছু সঠিকভাবে তৈরী করা। সর্বনিম্ন আনুমানিক চার্জ ১০,০০০ টাকা।
৬. পেমেন্ট গেটওয়ে: আপনি যদি ক্লায়েন্ট থেকে অনলাইনে অর্ডারের সময় পেমেন্ট কালেক্ট করতে চান; তবে আপনাকে একটি পেমেন্ট গেটওয়ে কানেক্ট করতে হবে। যেমন: SSLcommerce, Amarpay, Surjopay ইত্যাদি। পেমেন্ট গেটওয়ের জন্য একটি এককালীন ফি এবং প্রতি ট্রান্সজেকশনে ২% টাকা চার্জ পে করতে হয়। আবার কোন কোন গেটওয়ে মাসিক এবং বাৎসরিক চার্জ নিয়ে থাকে।
আপনি শুধু ক্যাশ অন ডেলিভারি নিতে চাইলে আপনার কোন পেমেন্ট গেটওয়ের প্রয়োজন নেই।
একটি ওয়েবসাইট করতে এই জিনিসগুলো বাধ্যতামূলক।
এছাডাও ওয়েবসাইটের উপর ভিত্তি করে বাড়তি কিছু জিনিস ডেভলপ করা হয়ে থাকে এটা বাজেটের উপর; তবে বাধ্যতামূলক নয়। যেমন: CDN, Firewall ইত্যাদি।
এখন প্রশ্ন হলো একজন ব্যবসায়ীর ই-কমার্স বাজেট ও প্লান কেমন হওয়া উচিত?
একটি ওয়েবসাইট মুলত একটি ব্যবসার দুটি কাজে ব্যবহৃত হয়।1
১. ব্রান্ডিং
২. সেলস।
যদি সেলস বেসড ই-কমার্স হয় তবে এখানে দুটি বিষয় প্রাধান্য পাবে।
১. SEO
২. ADs
SEO একটি ওয়েবসাইটকে গুগলে অর্গানিক র্যাংকিং দেয় এবং Ads মানুষের কাছে আপনার পন্যের প্রচার করে সেল জেনারেট করে।
এই দুটোই রেডিমেট CMS এ সহজেই সেট করা যায় এবং ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু কাস্টম CMS এ এটি প্রতিবার ডেভলপার দিয়ে কোড ইডিট করিয়ে নিতে হয়। যার জন্য বাড়তি সময় এবং টাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সব ওয়েব ডেভলপার সঠিকভাবে এটি করতে পারে না।
ই-কমার্সের জন্য ৩ ধরনের ব্যবসায়ী দেখা যায়।
১. একদমই নতুন
২. মাঝারি
৩. বড় ব্যবসায়ী (ইনভেস্টর)
তাহলে কার ওয়েবসাইট প্লান কেমন হওয়া উচিত?
১. একদমই নতুনঃ যদি আপনি একজন নতুন ব্যবসায়ী হয়ে থাকেন তবে আপনি একটি ফ্রি বা পেইড থিম ব্যবহার করে WordPress ওয়েবসাইট ডেভলপ করে নিন।
বাজেট: ১৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকায় একটি সুন্দর সাইট বানাতে পারবেন। যা আপনার ব্যবসার প্রয়োজনীয় সব সাপোর্ট প্রদান করবে।
২. মাঝারিঃ যদি আপনি একজন মাঝারি মানের ব্যবসায়ী হন এবং আপনার মোটামুটি বাজেট থাকে। তাহলে আপনি Shopify ব্যবহার করতে পারেন। এটি ওয়াল্ডের জনপ্রিয় ই-কমার্স বেসড CMS। যা ক্লাউল্ড বেসড হোস্টিং দেয়, সুন্দর ট্রাকিং ইনভায়রনমেন্ট প্রভাইড করে, সাইট খুব ফাস্ট লোড হয় এবং সবধরনের বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ফিচার আছে। মাল্টিলেয়ার মার্কেটিং পসিবল।
বাজেট: ৫০,০০০ থেকে ২০০,০০০ টাকায় আপনার চাহিদামত সাইট বানায় নিতে পারবেন।
৩.বড় ব্যবসায়ী (ইনভেস্টর): যদি আপনি একজন বড় ব্যবসায়ী বা ইনভেস্টর হন তাহলে আপনি একটি কাস্টম CMS ট্রাই করুন। এখানে আপনাকে আপনার প্রয়োজন কি কি তা একজন মার্কেটার ও ডেভলপারকে নিয়ে বসে আলোচনা করে; একটি UI/UX ডিজাইন করুন। এবার এই UI/UX এর প্রটোটাইপ নিয়ে একটি সার্ভে করুন। তারপর রিকমেন্ডেশন নিয়ে প্রথম ভার্সন লন্স করুন। এই ধরনের কাজে ৩-৫ জন ডেভলপারকে মাসিক ভিত্তিতে চাকরি প্রদান করে রাখতে হবে। পাশাপাশি আপনার প্রজেক্ট করার সময় ডেভলপারকে ইন্টারন্যাশনাল কোডিং স্ট্রাকচার মানতে হবে।
যেমন:
১. ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রাকচারে কোডিং
২. GitHub এ ভার্সন কন্ট্রোল
৩. ডাটাবেইজ মডেল ব্লুপ্রিন্ট
৪. প্রজেক্ট ডকুমেন্টশন
যদি স্ট্রাকচার সঠিকভাবে মেইনটেইন না করা হয়, তাহলে আপনার ডেভলপার যদি কোন আপডেট বা সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট করতে তারা ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে এক্সপার্টদের হেল্প নিতে সমস্যা হবে।
বাজেট: ৫০০,০০০ থেকে শুরু।
যদি এভাবে আপনি প্লান করে ওয়েবসাইটে ইনভেস্ট করেন তবে আপনি একটি ভালো মুনাফা পেতে পারেন। প্রায়শই দেখা যায় আমাদের দেশে সবাই না বুঝেই কাস্টম CMS বেসড প্লাটফর্ম ব্যবহার করে নিজের ওয়েবসাইট তৈরী করে থাকে। যখন মার্কেটিং করতে আসে, তখন অনুধাবন করে তার কস্ট বাড়তেই আছে; আর সে সেটা এফোর্ট করতে পারছে না। ফলে তাকে সড়ে আসতে হয়।
কার থেকে ওয়েবসাইট বানাবেন?
আপনার ইচ্ছামত অর্গানাইজেশন থেকে আপনি ওয়েবসাইট বানিয়ে নিতে পারেন। ওয়েবসাইট বানানোটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা সেক্টর। এখানে ওয়েবসাইট বানানোর থেকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে রেগুলার সাপোর্ট নেওয়াটা। যেদিন থেকে আপনি ওয়েবসাইট বানাচ্ছেন সেদিন থেকে আপনার সাপোর্ট লাগবে। তাই আপনি সার্ভিস নেবার আগে পারলে একটি সাপোর্ট এগ্রিমেন্ট করে নিবেন এবং একটু পুরাতন কম্পানী থেকে নেবার চেষ্টা করবেন। তাহলে ভালো সার্ভিস পেতে পারেন।
এছাড়া আমার নিজেরও একটি এজেন্সী রয়েছে। আমরাও সবধরনের সার্ভিস প্রদাণ করে থাকি। আপনি চাইলে আমাকে ইনবক্স করে আমাদের থেকেও সার্ভিস নিতে পারেন।
পরিশেষে, আপনার ওয়েবসাইটটির সাথে আপনার ব্যবসার ব্রান্ডিং, সেলস এবং ইনভেস্ট জড়িয়ে আছে। আমি আশাবাদী আপনি এই ৩টি বিষয় সঠিকভাবে বুঝে ওয়েবসাইটে ইনভেস্ট করবেন।
আমি সবসময় চেষ্টা করি আমার লেখার মাধ্যমে বিষয়বস্তু গুলো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে। আমার লেখা গুলো আপনাদের কেমন লাগে, কমেন্ট করে জানাবেন। এটি আমার লেখার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। ভাল লাগলে শেয়ার করে অন্যকে জানার সুযোগ করে দিবেন।
আপনার ব্যবসার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা


